Monday, January 26, 2026

সোশ্যাল মিডিয়া ও ভারতীয় রাজনীতি (ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক)


(This is an AI generated image)

একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আমাদের ভারতবর্ষের রাজনীতি বলতে বোঝাতো শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রচার, বিরাট জনসভার আয়োজন আর মিটিং মিছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে  প্রস্তর যুগ পেরিয়ে মধ্যযুগ এবং তা পার করে আজ আমরা পৌঁছে গেছি ডিজিটাল বা আধুনিক যুগে। আর এই ডিজিটাল যুগে রাজনীতিও- জনসভা, মিটিং মিছিলের গণ্ডি পেরিয়ে ডিজিটাল মাধ্যম-সোশ্যাল মিডিয়ায় অবতীর্ণ হয়েছে। বর্তমানে অন্যান্য দেশের মতো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতবর্ষেও-ডিজিটাল রাজনীতি দিনের পর দিন ব্যাপক হারে বেড়ে চলেছে। কিন্তু কিভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারতীয় রাজনীতির সূচনা হলো এবং ভারতীয় রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক প্রভাব গুলি কী সেটাই আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়।

সূচনা : ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতীয় রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন চোখে পড়ে। রাজনৈতিক দলগুলো হয়তো ধীরে ধীরে বুঝতে পারে জনগণের কাছে পৌঁছানোর জন্য শুধু সংবাদমাধ্যমের আর উপর নির্ভর করলে চলবে না বরং সোশ্যাল মিডিয়াকেও জনগণের কাছে পৌঁছানোর একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে দেখা উচিত। যদিও ২০১৪ সালের আগেও বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া মাধ্যমে যেমন- Twitter, Facebook, Instagram- ইত্যাদিতে রাজনৈতিক মতামত আদান-প্রদান, Post করা হতো, কিন্তু সেটা ছিল খুবই সামান্য।।

ভারতীয় রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়া :  

২০১৪ সালের পর সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়েছে রাজনৈতিক মবিলাইজেশনের ক্ষেত্রে। পলিটিকাল মবিলাইজেশন বলতে বোঝায় সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করা, সংগঠিত করা এবং কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য সক্রিয় করে তোলার একটা প্রক্রিয়া। আগে কাজটি সভা- সমিতি, মিছিল, পোস্টার ও লিফলেটের মাধ্যমে করা হতো। কিন্তু আজ সেই কাজটাই অনেক দ্রুত এবং অনেক বড় পরিসরে হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে।

একটি হ্যাশট্যাগ, একটি ভাইরাল ভিডিও বা একটি আবেগপ্রবণ পোস্ট লক্ষ লক্ষ মানুষকে কোনও রাজনৈতিক ইস্যুতে একসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করতে পারে। এই কারণে সোশ্যাল মিডিয়া আজ শুধুমাত্র মত প্রকাশের জায়গা নয়,বরং এটি একটি রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

যখন থেকে ভারতীয় রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়া যুক্ত হয়েছে বা সোশ্যাল মিডিয়ার পলিটিক্স শুরু হয়েছে তখন থেকে ভারতীয় পলিটিক্সের কিছু নতুন দিক আমরা লক্ষ্য করতে পারি। বলা চলে ভারতীয় রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়া পলিটিক্সের একটা বিরাট বড় প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন-

•⁠  ⁠বর্তমানে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলই নিজেদের শক্তিশালী সমর্থক দল তৈরি করার ক্ষেত্রে,

•⁠  ⁠নিজেদের প্রচারের ক্ষেত্রে এবং

•⁠  ⁠বিশেষ করে বিরোধী দলের ভুলত্রুটি জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং তাদের দুর্বল করে তোলার ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে চলছে। 

প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলই এখন 'Digital War Room'-কে রাজনীতি নতুন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিমূলক বিজ্ঞাপন, নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য আলাদা বার্তা,আবেগনির্ভর কনটেন্ট- সবই দেখা যাচ্ছে বর্তমান ভারতীয় রাজনীতিতে। রাজনীতি এখন আর শুধু নীতি আর আদর্শের লড়াই নয়, এটা মনোযোগ পাওয়ারও লড়াই।

সোশ্যাল মিডিয়া পলিটিক্স ও যুব সমাজ

রাজনৈতিক দল এবং নেতাকর্মীদের পাশাপাশি জনগণ এবং বিশেষভাবে যুব সমাজের ওপরেও সোশ্যাল মিডিয়া পলিটিক্স এর একটি বড় প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যুব সমাজ হলো সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে সক্রিয় অংশ। তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনীতি দেখে, শেখে এবং বোঝে। যারা হয়তো কখনও রাজনৈতিক সভায় যেত না, তারাও কোনো না সক্রিয় রাজনীতির অংশ হয়ে পড়ছে। হয়তো কখনো বুঝেশুনে আবার কখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই না বুঝেই তারা নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ তৈরি করে ফেলছে, মতাদর্শের সঙ্গে মিল খায় এমন রাজনৈতিক সংগঠনগুলির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এটা ভালো না খারাপ—এই বিতর্ক চলতেই পারে।

কিন্তু একটা কথা অস্বীকার করা যায় না—

সোশ্যাল মিডিয়া বহু তরুণকে রাজনীতির সঙ্গে প্রথমবার যুক্ত করেছে।

ভারতীয় রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক প্রভাব:

সোশ্যাল মিডিয়ার পলিটিক্সের কিছু স্পষ্ট সুবিধা আছে। যেমন- সোশ্যাল মিডিয়া মাধ্যমগুলো যেহেতু সবার জন্যই খোলা রয়েছে সেই কারণে যারা সরাসরি রাজনৈতিক দলগুলির কাছে নিজেদের নেতা কর্মীদের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া গুলি পেশ করতে পারেন না তারাও সোশ্যাল মিডিয়া পলিটিক্সের অংশ হয়ে নিজেদের রাজনৈতিক মত প্রকাশ করতে পারেন। সামান্য একটি শক্তিশালী হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে জনগন নিজেদের একটি আঞ্চলিক বিষয় বা দাবিকেও একটি বিরাট অংশের জনগণের কাছে তুলে ধরতে পারেন। একইভাবে জনগণ চাইলে সোশ্যাল মিডিয়ায় জোরালো আন্দোলন শুরু করে সরকারকে নিজের সিদ্ধান্ত বদল করতেও বাধ্য করতে পারে।।

ভারতীয় রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব : 

নিঃসন্দেহে সোশ্যাল মিডিয়া জনগণ এবং জন-কর্মীদের মধ্যেকার দূরত্ব অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। জনগণ নতুনভাবে নিজেদের দাবি দাওয়া নিজেদের মূল্যবান মতামত রাখার জায়গা পেয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকটি কয়েনের দুটো দিক থাকে...এক্ষেত্রেও সেই একই জিনিস রয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়া পলিটিক্সের সবচেয়ে খারাপ যে দিক গুলো দেখা যায়, তা হলো-

১) প্রথমত : বর্তমানে ছোট-বড় প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলই সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের একটি শক্তিশালী সমর্থক দল তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রচুর বিজ্ঞাপনে অর্থ প্রচার করছে। 

২) দ্বিতীয়ত :  বর্তমানে যে কেউ নিজের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক নিউজ বা এমন কোন ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারে যা সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। 

৩) তৃতীয়ত : সোশ্যাল মিডিয়াতে মানুষজন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই  নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে মিল খায় বা সামঞ্জস্যপূর্ণ কনটেন্টই দেখতে বেশি পছন্দ করে।  এভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে গুলি পরস্পর বিরোধী সামাজিক শ্রেণীবিভাজন সৃষ্টি করছে। 

৪) সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হওয়া সামান্য রাজনৈতিক আলোচনা, কমেন্টও যদি কারোর নিজস্ব মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত পছন্দের উপর আঘাত হানে তখন তা আবেগ ও যুক্তিকে ছাপিয়ে ব্যক্তিগত বা বড়সড় সামাজিক আক্রমণে পরিণত হতে পারে।।

উপসংহার :  সোশ্যাল মিডিয়া ভারতীয় রাজনীতিকে বদলে দিয়েছে—এটা সত্য। কিন্তু এই পরিবর্তন ভালো না খারাপ, সেটা নির্ভর করছে কিভাবে সোশ্যাল মিডিয়াকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটার উপর। হয়তো ভবিষ্যতের রাজনীতি আরও ডিজিটাল হবে কিন্তু সেই রাজনীতি যদি মানবিক না হয়,তাহলে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে গণতন্ত্র বাঁচানো সম্ভব নয়।

Contributed by:

Ajit Rajbanshi

Ajit is a Sixth Semester student reading Political Science (Major) at Maynaguri College.

সোশ্যাল মিডিয়া ও ভারতীয় রাজনীতি (ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক)

(This is an AI generated image) একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আমাদের ভারতবর্ষের রাজনীতি বলতে বোঝাতো শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রচার, বিরাট জনসভার আয়োজন...