ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা ফের একবার নীতিগত বিতর্কের কেন্দ্রে। ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন (UGC) কর্তৃক ২০২৬ সালের জন্য প্রস্তাবিত নতুন ইকুইটি রেগুলেশন বা অ্যান্টি-ডিসক্রিমিনেশন রুলস কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রশ্ন, উদ্বেগ এবং প্রতিবাদের সুর শোনা যাচ্ছে। যেখানে একদিকে এই নির্দেশিকা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমতা ও ন্যায় নিশ্চিত করার দাবি করছে, সেখানে অন্যদিকে এর কিছু ধারা সামাজিক বিভাজন ও সাংবিধানিক মূল্যবোধকে ঘিরে গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরছে। ফলে বিষয়টি এখন আর কেবল প্রশাসনিক নয়-এটি জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
UGC-এর ভূমিকা : ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। UGC-এর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হল বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য প্রশাসনিক ও নীতিগত নির্দেশিকা প্রণয়ন করা এবং সেগুলির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। এই ধারাবাহিকতায়, গত ১৩ জানুয়ারি UGC একটি নতুন নির্দেশিকা জারি করে, যা মূলত ২০১২ সালের জাতিভিত্তিক বৈষম্য বিরোধী নিয়মের ব্যাখ্যার সঙ্গে যুক্ত। পূর্ববর্তী নিয়ম অনুযায়ী, কাস্ট বেসড ডিসক্রিমিনেশন বা জাতিভিত্তিক বৈষম্য বলতে শুধুমাত্র SC, ST এবং OBC শ্রেণীর নাগরিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বৈষম্যকেই বোঝানো হতো। এর ফলে সাধারণ বা অসংরক্ষিত শ্রেণীর পড়ুয়া ও অধ্যাপকরা জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রে কার্যত আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিলেন—এটাই এই বিতর্কের মূল কেন্দ্রে উঠে আসে।
প্রেক্ষাপট : বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ যেভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে, তা নিয়ে সমাজের নানা মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। রোহিত ভেমুলা ও পায়েল তাদভি–র মতো ঘটনাগুলি এই ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সময়মতো ও ন্যায্যভাবে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটেই UGC-কে এমন একটি শক্তিশালী ও কার্যকর বিধিমালা তৈরির দাবি উঠেছিল, যা কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব ক্ষেত্রেও প্রয়োগযোগ্য হবে। নতুন নিয়মের উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্য সংক্রান্ত অভিযোগের একটি বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংজ্ঞা তৈরি করা, যাতে কোনও পড়ুয়া বা শিক্ষক নিজেকে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার শিকার মনে না করেন।
বিতর্ক ও সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান : তবে UGC-র এই নতুন ও বিতর্কিত বিধিমালা প্রকাশের পর দেশজুড়ে নানা মহলে আপত্তি ওঠে। সমালোচকদের মতে, এই নিয়ম সমাজে আরও বিভাজন তৈরি করতে পারে এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার মূল ভাবনাকে দুর্বল করতে পারে। রাজনৈতিক চাপ, বিক্ষোভ এবং জনস্বার্থ মামলার প্রেক্ষিতে বিষয়টি গড়ায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে।
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট এই নতুন নির্দেশিকার উপর স্থগিতাদেশ জারি করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এর সামাজিক প্রভাব গভীর হতে পারে, তাই চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত এই নিয়ম কার্যকর করা সমীচীন নয়।
UGC ২০২৬-এর ইকুইটি রেগুলেশন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করার পথ কোনটি? শুধুমাত্র নিয়ম প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, তার ন্যায্য প্রয়োগ ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও সমানভাবে জরুরি। এই বিতর্ক দেখিয়ে দেয় যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেবল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়, বরং সমাজের মূল্যবোধ গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
Source:
Links: https://vajiramandravi.com
Contributed by:
Arpita Sarkar
Arpita is a Fourth Semester student at the Dept. of Political Science, Maynaguri College majoring in Political Science.

No comments:
Post a Comment